সীমান্ত হত্যা ও বাংলাদেশ

সব খবরের অন্তরালে বর্তমান সময়ের আলোচিত খবর হতে পারে সীমান্ত হত্যা। পত্রিকার এক কোণে ছোট্ট কলাম কিংবা টেলিভিশনের জাতীয় সংবাদের শেষে ছোট সংবাদটিই অনেক গুরুতপূর্ন ইসু হয়ে দাড়িয়েছে জাতির সামনে।

একেতো ভারত তার বিতর্কিত শুট অন সাইট (দেখা মাত্র গুলি) নীতি থেকে সরে আসছে না এবং বার বার বলছে তারা ইচ্ছে করে এ হত্যা করছে না।বাংলাদেশী নাগরিকদের ওপর তারা এ দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে। তার ওপর এ হত্যার পেছনে বাংলাদেশ সরকারের কিছুটা উদাসীনতা আছে। যদিও সীমান্ত হত্যার পরিমান কিছুটা কমেছে বর্তমান সরকারের সময়ে।

Indian Border Security Force (BSF) personnel patrol along the border with Bangladesh, outside the Fulbari Border post some 18 km from Siliguri on August 13, 2008 ahead of the country's 62nd Independence Day. Security has been tightened at the borders between India and its neighbouring countries like Bangladesh and Nepal. India is set to celebrate 61 years since its independence from British rule on August15, 2008. AFPPHOTO/Diptendu DUTTA.

Indian Border Security Force (BSF) personnel patrol along the border with Bangladesh, outside the Fulbari Border post some 18 km from Siliguri on August 13, 2008 ahead of the country’s 62nd Independence Day. Security has been tightened at the borders between India and its neighbouring countries like Bangladesh and Nepal. India is set to celebrate 61 years since its independence from British rule on August15, 2008. AFPPHOTO/Diptendu DUTTA.

কিন্তু ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী আরো কয়েকটি দেশ আছে। সেসব সীমান্তের কথা চিন্তা করুন। চীনের দিকে ভারত চোখ তুলে তাকাতেই পারে না।তাদের একটা মানুষকেও যদি অবৈধভাবে গুলি করা হয়, তাহলে চীন সেদিনই ভারতের বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষনা করবে। পাকিস্তান সীমান্তে দেখুন, ভারত পাকিস্তানের একটা মানুষ যদি হত্যা করেছে, পাকিস্তান তিনটি হত্যার মাধ্যমে তার প্রতিশোধ নিয়েছে। এমনকি আজ পর্যন্ত তাই চলছে।

এবার আসুন আমার দেশের সীমান্তে। এখানে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী পাখির মত মানুষ গুলি করে মারছে। নির্যাতন করছে। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) দ্বারা প্রায় ১০২২ (এক হাজার বাইশ) জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছে !

যেখানে ২০০১ সালে ৯৪ জন নিহত হন,
২০০২ সালে ১০৫ জন নিহত হন,
২০০৩ সালে ৪৩ জন নিহত হন,
২০০৫ সালে ১০৪ জন নিহত হন,
২০০৬ সালে ১৪৬ জন নিহত হন,
২০০৭ সালে ১২০ জন নিহত হন,
২০০৮ সালে ৬২ জন নিহত হন,
২০০৯ সালে ৯৬ জন নিহত হন,
২০১০ সালে বিএসএফ ৭৪ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করে,
২০১১ সালে হত্যার শিকার হন ৩১ জন,
২০১২ সালে হত্যার শিকার হন ৩৮ জন,
২০১৩ সালে হত্যার শিকার হন ২৯ জন,
২০১৪ সালে হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে ও ২০১৫ সালে বিএসএফ হত্যা করেছে ৪৫ জনকে৷
কিন্তু এসব হত্যার যেমন কোন সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে না, তেমনি হচ্ছেনা কোন বিচার।
২০১১ সালে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী কুড়িগ্রাম সীমান্তে ১৫ বছর বয়সী এক তরুনীকে হত্যা করে পাঁচ ঘন্টা ধরে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলিয়ে রাখে !
এই নির্মম হত্যাকান্ড বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হতে থাকে। যার প্রেক্ষাপটে এবং বাংলাদেশের চাপে ফেলানী হত্যার বিচার শুরু হলেও হত্যাকারী অমীয় ঘোষকে কোন শাস্তি ছাড়াই মুক্তি দেওয়া হয়।
মূলত হত্যার পর কোন ধরনের বিচার না হওয়ার কারনেই বিএসএফ সদস্যরা হত্যাকান্ড চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে।

সমস্যা হলো বাংলাদেশ পাকিস্তানের মত প্রতিশোধ নিতে যায়নি। ভারতের দিকে সবসময় বন্ধুত্বের হাতটাই বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাই বলে বাংলাদেশকে দূর্বল ভাবার কোন অবকাশ নেই। ২০০১ সালের ১৮ই এপ্রিলের কথা মনে আছে তো…? কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারীর বড়াইবাড়ি গ্রামে অবৈধভাবে ঢুকে বিএসএফ সদস্য প্রায় ৭০ টি বাড়িতে আগুন দেয় এবং বিডিয়ারদের ওপর অতর্কিত হামলা করে। বাংলাদেশের বিডিয়ার সদস্যরা সাথে সাথে পাল্টা প্রতিবাদ করে। প্রায় পাঁচ ঘন্টার যুদ্ধের পর বিএসএফ ১৬ টি মৃতদেহ ফেলে পিছু হটে। এ যুদ্ধে শাহাদাৎ বরণ করেছিলেন তিন বিডিয়ার, বীর।

এখন দেশের ভিতরের পরিস্থিতি দেখা যাক। নিজে নিজেই একবার চিন্তা করুন, সীমান্তে মৃত্যু হতে পারে জেনেও কেনো মানুষ সেখানে যাচ্ছে…? একবার দেখলেই বিএসএফ গুলি করে হত্যা করবে এটা জানার পরও মানুষ কেনো মরণ ফাঁদে পা দিচ্ছে…?

প্রথম কারণ অভাব বা দারিদ্রতা। বিশেষ করে উত্তরের জেলাগুলোর মানুষদের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে কাজ করার প্রবনতা দেখা যায়। আপনি শুনে আশ্চর্য হবেন যে উত্তরের কিছু কিছু জায়গায় মোট শ্রমিকের ১৫/২০ শতাংশ এখন ভারতে অবৈধপথে পাড়ি দিয়েছেন। দারিদ্র বিমোচনের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তার যথেষ্ট উপকার পাওয়া যাচ্ছেনা। একাজে গিয়ে বারবার সরকারের তহবিলই নষ্ট হচ্ছে। কিছু দূর্নীতিবাজদের জন্য সম্পূর্ণ সফল হচ্ছে না সরকার।

আর দারিদ্রতার কবলে পরে মানুষ ভারতে গিয়ে কাজ খোঁজা বা মাদকব্যাবসার মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। আর এসব করতে গিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের চোখে পড়লেই তারা তাদের শুট অন সাইট নীতির প্রয়োগ করছে।
– দ্বিতীয় কারণটি হলো বাংলাদেশ একসময় ভারতেরই একটা অংশ ছিলো।

সেজন্য তাদের একে অপরের মাঝে আত্বীয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠতো। দেশ ভাগ হবার পরও বিভিন্ন কারনে তাদের যাতায়াতের প্রয়োজন হয়। সবার পক্ষে পাসপোর্ট ভিসা করে সীমান্ত পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়। তখন তারা বেছে নেয় অবৈধ পথে যাতায়াতের রাস্তা। আর এই যাতায়াত করতে গিয়েই বিএসএফ এর হাতে খুন হচ্ছে সাধারন বাংলাদেশী নাগরিকগন।

এই হত্যাকান্ড যত তারাতারি সম্ভব বাংলাদেশকে বন্ধ করতে হবে। সেটা হতে পারে দারিদ্র বিমোচোনের মাধ্যমে কিংবা শুট অন সাইট নীতি বন্ধ করার ব্যবস্থা করে।

Palash-Talukder
♦ লেখকঃ পলাশ তালুকদার,
শিক্ষার্থী (১১তম ব্যাচ)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

এই সংক্রান্ত আরও খবর...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *